ইউরোপের জন্য যেন হঠাৎ করেই ধাক্কা এলো আমেরিকার পক্ষ থেকে। যে ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ করতে মার্কিন প্রশাসন সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছে, ইউরোপের প্রতিরক্ষায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীন সেই আমেরিকা এখন যেন ইউরোপকে অনিরাপদ রেখে চলে যাচ্ছে। ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, তিন বছর আগে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায় তখন আমেরিকা ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে একত্রেই আগ্রাসন প্রতিরোধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন ট্রাম্পের অধীন আমেরিকা ইউরোপীয় পক্ষগুলোকে বাদ দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসে মস্কোকেই শক্তিশালী করেছে।
ইউরোপের জন্য প্রথম ধাক্কা আসে যখন আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, আমেরিকা আর ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য ‘প্রাথমিক গ্যারান্টর’ হিসেবে থাকবে না। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইউক্রেন ও ইউরোপকে পাশ কাটিয়ে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করবেন।
পরে ১৪ ফেব্রুয়ারি জার্মানির মিউনিখে সিকিউরিটি কনফারেন্সে আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইউরোপকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। ইউরোপীয় নেতারা জনগণের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের মনোভাবকে আমলে না নিলে গণতন্ত্র টিকতে পারবে না।
দশকের পর দশক আমেরিকাকে মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা ইউরোপীয় নেতৃত্ব এখন শঙ্কা করছেন, আমেরিকার হাতেই তাদের প্রতিরক্ষা বিঘ্নিত হয় কি না।
এদিকে মঙ্গলবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধে আমেরিকা ও রাশিয়ার প্রতিনিধি দলের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। এ বৈঠকে সফলতার ওপর দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে বৈঠক হবে।
ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধের জন্য ট্রাম্পের চাপের মুখেই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে মিলিত হয়েছে ইউরোপের ১১ দেশের নেতারা। সোমবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আমন্ত্রণে প্যারিসে বৈঠকে আসেন জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলস, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিসহ অন্যরা। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিচালনাকারী ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়ন বৈঠকে ছিলেন।
বৈঠকের বিষয়ে ভন ডার লিয়ন বলেন, ‘ইউরোপের নিরাপত্তা এখন এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এটি ইউক্রেনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিষয়েও। আমাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।’
তিন বছর আগে ইউক্রেনে যখন রাশিয়া আগ্রাসন চালায়, তখন দুই নীতির ভিত্তিতে আমেরিকা অগ্রসর হয়। প্রথমত ইউক্রেনের সংযোগ ছাড়া ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসনকে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করবে। ইউরোপীয় নেতারা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছেন, ট্রাম্পের অধীন মার্কিন প্রশাসন অবহেলার সঙ্গেই দুই নীতি পরিত্যাগ করেছে।
ট্রাম্পের আগ্রাসী ও পরিবর্তিত ভূমিকায় ইউরোপ শঙ্কার মধ্যে পড়েছে। ইউক্রেনের ট্রাম্প তার অর্থমন্ত্রী স্কট বেসান্তকে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে বেসান্ত ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে জানান, রাশিয়ার আগ্রাসন মোকাবিলায় আমেরিকা ইউক্রেনকে যে ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অর্থ সাহায্য দিয়েছে, দেশটির খনিজ সম্পদের অর্ধেক আমেরিকার হাতে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে ইউক্রেন যেন সে অর্থ ফেরত দেয়। জেলেনস্কি ট্রাম্পের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
ট্রাম্পের অস্থিরচিত্তের সিদ্ধান্তে কিছু ইউরোপীয় নেতা ভয় করছেন, তিনি ইউরোপকে পশ্চিমা ও রাশিয়ার প্রভাবিত অঞ্চলের মধ্যে বিভক্ত করে ফেলবেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে পুতিন দাবি জানিয়েছিলেন ন্যাটো যেন তার মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোকে প্রত্যাহার করে ১৯৯৭ সালের সীমান্তে অবস্থান নেয়। যদিও রাশিয়া এখন আর এ দাবি করছে না, তবে ইউরোপকে নিরাপত্তাহীন রেখে ট্রাম্প এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন বলে শঙ্কা করা হচ্ছে।
যদি আমেরিকা পূর্ব ইউরোপ তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়, তবে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ অন্য ইউরোপীয় মিত্ররাও ঝুঁকি বিবেচনায় তাদের সেনা মোতায়েনে আগ্রহী হবে না। এ ছাড়া সম্প্রতি ‘পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ’ বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করেছে ট্রাম্পের অধীন মার্কিন প্রশাসন। এটি ইউরোপে মোতায়েন আমেরিকার কৌশলগত পরমাণু অস্ত্রকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে বলে মনে করছে ইউরোপীয় নেতৃত্ব।