খেলাপি ঠেকাতে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ বাড়িয়েছে ব্যাংকগুলো। গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করেছে। তার আগের বছরের একই সময়ে পুনঃতফসিল করার পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এর পরও ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো বেড়েছে। আগের সব রেকর্ড ভেঙে গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গত সরকারের আমলে খেলাপি কম দেখাতে নানারকম ছাড় দেওয়া হয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালা সহজ করে ২০২২ সালে পুরো প্রক্রিয়া ব্যাংকের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এর পর থেকে পুনঃতফসিলের জন্য আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসতে হচ্ছে না। আগে একটি ঋণ পুনঃতফসিলে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হতো, আর তিন দফায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করা যেত। এর বাইরে সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসতে হতো। তবে নতুন নীতিমালায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ চার দফায় ২৯ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়। আর ডাউনপেমেন্ট ধরা হয় মোট বকেয়ার আড়াই শতাংশ। অপরদিকে ব্যবসায় মন্দা থাকা এবং এ সরকারের আমলে আগের সরকারের লুকানো তথ্য বের করে দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে পুনঃতফসিল করা ঋণ বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো, যার পরিমাণ ১৭ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো করেছে ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলো এ সময় কোনো খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেনি।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর পুনঃতফসিল না হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, অন্য ব্যাংকগুলো বড় গ্রাহকদের ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী থাকে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এটা পুরো উল্টো। এসব ব্যাংক ছোট ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী। তাই তাদের খেলাপি ঋণ কম। খেলাপি ঋণ কম থাকার কারণে তাদের পুনঃতফসিল করতে হয় না। অপরদিকে অন্য ব্যাংকগুলো বড় গ্রুপকে ঋণ দিয়ে আদায় করতে পারে না। একটা সময় এসব ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে পুনঃতফসিল করার জন্য বড় গ্রুপগুলোর পেছনে ঘোরে ব্যাংকগুলো।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ব্যাংকঋণের সুদহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা হঠাৎ প্রেশারে পড়েছে। কারণ খরচ যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেভাবে আয় হচ্ছে না। অপরদিকে কিছু ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার পরিস্থিতিও নেই। এসব ব্যাংকের ব্যবসায়ীরাও সংকটে রয়েছেন। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গত সরকার ব্যাংক খাতের অনেক তথ্য লুকিয়ে রেখেছিল। বর্তমান সরকার লুকানো জিনিস সব বের করে বাস্তব চিত্র দেখতে চাচ্ছে। রাজনৈতিক চাপ না থাকার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও লুকানো জিনিস প্রকাশ করছে। গভর্নর এরই মধ্যে জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এসব কারণে পুনঃতফসিল বেড়েছে। আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি এখন অধিক খারাপ। ব্যবসার ক্ষেত্রে সবকিছুর দামই বাড়ছে। আবার ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। তাই ব্যাংকগুলো তাদের ব্যালেন্স শিট ভালো দেখাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে ঝুঁকছে। ফলে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে বারবার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে ছাড় দেওয়ার পরও ইতিবাচক কিছু হচ্ছে না। উল্টো যে ঋণগুলো পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা হচ্ছে, সেই ঋণ পরিশোধে টালবাহানায় আবার খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের শেষে দেশের ব্যাংক খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল দুই লাখ ৮৮ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৮ দশমিক ৭০ শতাংশ ঋণ আবার খেলাপির খাতায় উঠেছে।